নির্দয় ভালোবাসা || ছোটগল্প ||নুর আহমেদ সিদ্দিকী ||আমার খবর - amarkhobor24.com

শিরোনাম

Home Top Ad


Monday, June 8, 2020

নির্দয় ভালোবাসা || ছোটগল্প ||নুর আহমেদ সিদ্দিকী ||আমার খবর

রাতে চাঁদের অালোতে প্রিয় মানুষের সাথে খোশগল্পে মেতে উঠেছে সাদিয়া রহমান।ক'দিন আগেও  যা স্বপ্ন ছিল অাজ তা বাস্তবে চোখের সামনে দেখছে।হৃদয়ের সব অাবেগ, অনুভূতি আর ভালোবাসা দিয়ে প্রেমালাপে মত্ত।আসমানের তারাকারাজি তাদের পবিত্র প্রেমের সাক্ষি।দু'জনই নিজেদের খুব সুখি ভাবছে।দু'জনের চাওয়ায় আজ সত্যি হয়েছে।সাইফুল সবেমাত্র মাস্টার্স শেষ করে চাকরিতে জয়েন্ট করেছে।গেল মাসে সে সাদিয়াকে বিয়ে করে একাকিত্বের অবসান ঘটান।সে অবাক হয়ে ভাবছে তার বিয়েটা ঘটা করে হয়ে গেছে।সাইফুল শৈশব থেকে শান্ত প্রকৃতির। কারো সাথে তার শত্রুতা নেই।নম্রতা তাকে করেছে দামী,ভদ্রতা তাকে করেছে সম্মানী,লজ্জা তাকে করেছে নির্মল, মায়াবি চাহনি তাকে দিয়েছে বিমলিন জ্যোতি।পড়ালেখায় ছিল মনোযোগী।শিক্ষকের প্রতি তার অানুগত্য বর্ণনাতীত। সাদিয়া রহামন,ছটপটে এবং স্পষ্টবাদী। দু'জনের এই মিলনের পেছনে এক বিস্ময়কর ঘটনা রয়েছে যা মনে হলে দু'জনেই হাসে।সাদিয়া,মাঝে মাঝে বলে তুমি আমার জীবনে উে  এসে জুড়ে বসেছো।সাইফুলের একটাই উত্তর, ভাগ্যের লিখন যায়না খন্ডন।
কত স্মৃতি,কত বেদনা,সুখ দুঃখের ইতি টেনে এসে দাঁড়িয়েছে প্রেমের রাজ্যে।যে রাজ্যের রাজা সাইফুল আর রানী সাদিয়া।দুই দেহ যেন একই প্রাণে মিশেছে।সাইফুল মাঝে মাঝে বলে এই সুখ কপালে সইবে তো?সাদিয়া, সাইফুলের মুখ চেপে ধরে বলে, এমন কথা মুখেও আনবেনা। যতদিন বাঁচি সুখ দুঃখের সমান ভাগিদার হয়ে বাঁচব।

সাইফুল  মাস্টার্সের ভাইবা দিয়ে আসার পথে রাস্তায় একটি ব্যাগ পড়ে থাকতে দেখে।ব্যস্ত শহরে কেউ এই ব্যাগ তুলছে না দেখে  সাইফুল ব্যাগটি হাতে তুলে নেয়।বাসায় গিয়ে ব্যাগ খুলতেই সে যেন আসমান থেকে পড়ে।ব্যাগে সব এক হাজার টাকার নতুন নোট।কৌতুহলী হয়ে সব টাকা বের করে গণা শুরু করে।হিসাব করে দেখে বিশ লাখ টাকা। সাথে একটি পাসপোর্ট,একটি গাড়ির লাইসেন্স এবং একটি নোটবুক।সে নোট বুক খুলে দেখে প্রথম নাম্বারটি রিদওয়ান নামে লেখা যা পাসপোর্টেও আছে।সে বোঝতে পারল পাসপোর্ট যার টাকাও তার ।নোটবুক থেকে নাম্বার তুলে ফোন দেয়।অপরপ্রান্ত থেকে বিচলিত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করা হলো আপনি কে এবং কাকে চাইছেন? সাইফুল নিজেকে সামলে নিয়ে উত্তর দিল, আমি রিদওয়ান সাহেব কে চাইছি।ভেজা কণ্ঠে বললেন আমিই রিদওয়ান।সাইফুল বললেন,আপনার কোন কিছু হারিয়ে গেছে? রিদওয়ান আরো বিচলিত হলেন।নিজেকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে বললেন, বিশ লাখ টাকা এবং একটি পাসপোর্ট হারিয়ে গেছে।সাইফুল নিশ্চিত হলেন,তিনিই টাকা এবং পাসপোর্ট এর প্রকৃত মালিক।সাইফুল ব্যাগসহ চট্টগ্রাম বহাদ্দারহাট চাঁন্দগাও নতুন অাবাসিকস্ত রিদওয়ান এর বাসায় যান।রিদওয়ান এমন সৎ লোক দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে তাকে জড়িয়ে ধরেন।সাইফুলের সততায় মুগ্ধ হয়ে তাকে তিন লাখ টাকা পুরস্কৃত করতে চাইলে সে তা নিতে অস্বীকার করেন।রিদওয়ান সাহেব, এমন সৎ মানুষ  বিংশশতাব্দীতে হতে পারে ভেবে অবাক হলেন।তিনি সাইফুল সম্পর্কে বিস্তারিত জানলেন।এর কিছু দিন পর সাইফুলকে ফের বাসায় ডেকে পাঠান।প্রস্তাব দেন একটি পেট্টোল পাম্পে জিএম হিসেবে চাকরি নিতে।সাইফুল এক বাক্যে রাজি হয়ে যান।

সাইফুল নিজেকে ধন্য মনে করছে।ছোট বেলায় তিনি পড়েছেন, সততাই সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা আজ তার বাস্তব প্রমাণ পেয়েছে।চাকরির মাইনেও ভালো।মনে মনে চিন্তা করছে ঘর সংসার করবে।সাইফুলের আপনজন বলতে তেমন কেউ নেই। ছোট বেলায় মা বাবা ও দুই বোন গাড়ি এক্সিডেন্টে মারা যায়।ভাগ্যক্রমে সাইফুল মায়ের কোল থেকে ছিটকে পাশে পড়ে যায়।আশ পাশের লোকজন এসে সাইফুলকে উদ্ধার করে।  মা বাবা আর দুইবোনকে বাঁচানো যায়নি।ছোট বেলা থেকে চট্টগ্রামে  ফুফির বাসায় থাকে।ইন্টার পরীক্ষার পর ফুফি মারা গেলে সে ফুফাত ভাইদের ঠাট্টা বিদ্রুপ সইতে না পেরে  ভাড়া বাসা নিয়ে থাকে।পড়ালেখার পাশাপাশি  টিউশন করে যাবতীয় খরচ মেটাত।সব দুঃখের স্মৃতি গুলো চোখের সামনে সিনামার গল্পের মত এক এক করে ভেসে উঠছে।হঠাৎ একদিন রিদওয়ান সাহেব তাকে বাসায় ডেকে পাঠান।প্রস্তাব দেয়, তার ছোট মেয়েকে বিয়ে করতে।সাইফুল লাজুক প্রকৃতির।বিয়ের কথা শুনে মাথা নত করেছে আর উঠাচ্ছেনা।ক্ষণিক পরে বলল,আপনারা যা ভালো মনে করেন।আমার কোন অাপত্তি নেই।এর এক সপ্তাহের মাথায় ধূমধাম করে বিয়ে হয়ে যায়।আপেল রঙের, গোলগাল চেহারা,গঠন প্রকৃতি মধ্যম।দু'জনকে খুব মানিয়েছে।বছর পাঁচ এক চট্টগ্রাম শহরে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকলেও পরে ফেনীর গ্রামের বাড়িতে স্ত্রী সন্তান নিয়ে বসাবাস শুরু করেন।

সে এখন পাঁচ সন্তানের জনক।দুই ছেলে তিন মেয়ে।নিজের টাকায় দুই তলা করে পাকা ঘর করেছে।সুখ স্বাচ্ছন্দ্যে জীবন কাটছে।সাইফুল মাঝে মাঝে বাড়ি যায়।মাসে দুই তিন বার স্ত্রী সন্তানের টানে গ্রামের বাড়ি ছুটে  যায়।এখন স্বপ্ন সন্তানদের মানুষের মত মানুষ করে গড়ে তোলা।এভাবে দিন, মাস বছর যেতে যেতে বিবাহিত জীবনের ২৭ বছর অতিক্রম করেছে।কখনো দু'জনের মাঝে ঝগড়া হয়নি।তবে,বেশ মান অভিমান হত।কবি সাহিত্যিকরা বলে,মান অভিমানে ভালোবাসার বাঁধন মজবুত হয়।বাড়িতে গেলে স্ত্রীর ভালোবাসায় অতীতের সব কষ্ট নিমিষেই ভুলে যেত।গত কয়েক দিন ধরে বেশ জ্বর হয়েছে।সাথে সর্দি কাশি।সারা বিশ্বে করোনাভাইরাসে মানুষের মৃত্যুর মিছিল চলছে।এর মাঝে তার শরীর অসুস্থ।অফিসে সবাই মনে করছে সে করোনা অাক্রান্ত।তাই অফিস থেকে পনেরো দিনের ছুটি দিয়েছে।গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার পথে প্রথমে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে করোনার পরীক্ষার জন্যে নমুনা দিয়ে অাসে।শরীর খুব দুর্বল।শ্বাসকষ্ট অনুভব হচ্ছে।

বাড়িতে এসে দেখে সবাই পাল্টে গেছে।পাশে কেউ অাসছেনা।ছোট ছেলে সাঈফ অাদনান কে কাছে ডাকলে মা যেতে বারণ করে।কিছুক্ষণপর  স্ত্রী সাদিয়া বলে, তুমি ঐ রোমে বস আমি খাবার নিয়ে আসছি।যেই মাত্র সাইফুল রোমে ঢুকেছে সাথে সাথে বাইরে দিয়ে দরজা আটকে দেয়  তার স্ত্রী।স্ত্রীর এমন রূপ দেখে সে অবাক হয়েছে।যে স্ত্রী সুখ দুঃখ এক সাথে ভাগাভাগি করে দিনযাপন করবে বলে ওয়াদা করেছিল আজ সে এতটা নিষ্টুর হতে পারে সে কখনো কল্পনাও করেনি।দুপুরে পানি চেয়েছে,খাবার চেয়েছি দেয়নি।মাঝে মাঝে ছেলে মেয়েরা বাবার কাছে আসতে চাইলে মা তাদের বকা দেয়।সে একফোটা পানির জন্যে ছটপট করছে।স্ত্রী সন্তানকে কাতর কণ্ঠে ডাকছে। তার ডাকে কেউ সাড়া দিচ্ছেনা।পাষাণী স্ত্রীর একটুও মন গলেনি।রাতে খুব তৃষ্ণা পায়। বেড়েছে জ্বর,কাশি ও শ্বাসকষ্ট। কান্নাজড়িত কণ্ঠে স্ত্রীকে ডেকেছে সাড়া দেয়নি।হৃদয়টা হু হু করে কাঁদছে।বুঝানোর ভাষা নেই।কিসের ভালোবাসা? আজ যেন সব অভিনয়।নিষ্ঠুর দুনিয়া পাষাণী স্ত্রী আর সন্তানের আচরণে হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে।বুকে প্রচন্ড ব্যথা, চোখে অশ্রুর বন্যা।ধীরে ধীরে শরীর নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে।ক্রমেই সে শরীরের নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে।এই বুঝি প্রাণবায়ু উড়ে যাবে।জীবনের হিসেবের খাতা খুলে দেখে নেকীর পরিমাণ নগন্য  ।অঝরধারায় অশ্রু প্রবাহিত।অস্পষ্টস্বরে বলছে লা- ইল্লাহা ইল্লাল্লাহ।অন্তিম মুহুর্তে  আল্লাহর কাছে হাত তুলেছে সে।হে অাল্লাহ, স্ত্রী সন্তান নিষ্ঠুর হলেও তুমি তো দয়ালু।অামাকে ক্ষমা করে দাও।নির্দয় ভালোবাসা বুঝিয়ে দিয়েছে তুমি বিনে কেউ আপন নয়।চোখ দুটি বন্ধ হয়ে গেছে।প্রাণবায়ু উড়ে গেছে।মাটিতে পড়ে রয়েছে নিথর দেহ।

লেখকঃনুর আহমেদ সিদ্দিকী

No comments:

Post a Comment

Pages