গণতন্ত্রের দেশে কেনো বর্ণবাদের চাষাবাদ? ||মতামত || কে এম হুমায়ুন কবির || আমার খবর - amarkhobor24.com

শিরোনাম

Home Top Ad


Monday, June 15, 2020

গণতন্ত্রের দেশে কেনো বর্ণবাদের চাষাবাদ? ||মতামত || কে এম হুমায়ুন কবির || আমার খবর

যুগে যুগে অত্যাচারের অন্যতম হাতিয়ার ছিল বর্ণবাদ । মানুষকে দৈহিক গঠন,  ত্বকের রং, ধর্ম, জাতি বা গোষ্ঠীগত পরিচয় প্রভৃতির বিচারে বিভক্ত করে উঁচু বা নিচু হিসেবে শ্রেণিকরণের মাধ্যমে সুযোগ-সুবিধা বণ্টনের তারতম্য করাই বর্ণবাদ। পৃথিবী  থেকে যখন বর্ণবাদের কবর রচিত হওয়ার কথা ঠিক তখনি মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে বর্ণবাদীরা। যদিও সরকারীভাবে নিষিদ্ধ বর্ণবাদ তবুও বর্ণবাদী হায়েনাদের তান্ডব আমরা মাঝেমধ্যেই দেখি। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো গণতন্ত্রের দেশেই বর্ণবাদের অবাধ চাষাবাদ হচ্ছে। যেখানে গণতন্ত্রের মূল কথাই হচ্ছে ‘সকল মানুষ সমান’ সেখানে বর্ণবাদ কিভাবে পাখা গজায় তাই ভাববার বিষয়। 
ইসলাম বর্ণবাদকে নির্মূল করে আদর্শ রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠা করে এর উদাহরণ বিশ্ববাসীর সামনে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তাইতো আমরা দেখি হাবশার হযরত বিলাল(রা) কে ইসলামের মুয়াজ্জিন রূপে। কোরআনে কারীমের অসংখ্যা আয়াত এবং রাসূল(সা) এর অনেক হাদিসে বর্ণবাদ কে নিষেধ করেছেন। এমনকি বিদায় হজের ভাষণে রাসূল(সা) বলেছেন, হে লোক সকল, তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই আল্লাহর কাছে অধিকতর সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী যে তোমাদের মধ্যে অধিক তাকওয়া অবলম্বন করে, সব বিষয়ে আল্লাহর কথা অধিক খেয়াল রাখে। ধর্ম বিশ্বাস, গাত্রবর্ণ, শক্তি ও বংশের অহংকারবশত কোনো ব্যক্তি বা জাতি কর্তৃক নিজেদের শ্রেষ্ঠ বলে দাবি করাকে ইসলাম প্রত্যাখান করে। সাম্প্রদায়িকতা ও বর্ণবাদকে ইসলাম সমর্থণ দেয় না।

বর্তমান বিশ্বে অন্যতম সমস্যা হচ্ছে বর্ণবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা। আমরা অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্যে করছি যে, বৈষ্যম্য ও বর্ণবাদ দূরীকরণের ব্যাপারে জোর প্রচেষ্ঠা চালানো সত্ত্বেও বিশ্ব থেকে এখনো বৈষম্য ও বর্ণবাদের অবসান হয়নি। এমনকি এই বর্ণবাদের কারণেই বিশ্বব্যাপী অনেক মানুষকে প্রাণ হারাতে হচ্ছে। গত ২৫ শে মে যুক্তরাজ্যের মিনেসোটা রাজ্যেও মিনিয়াপোলিস শহরে পুলিশি নির্যাতনে জর্জ ফ্লয়েড মারা যান।

বর্ণবাদ মূলত কি? এ বিষয়ে জাতিসংঘ সনদের মতে, There is no distinction between the terms racial discrimination and ethnic, discrimination and superiority based on racial differentiation is scientifically false, morally condemnable, socially unjust and dangerous, and that there is no justification for racial discrimination, in theory or in practice, anywhere.” 
মোট কথা হলো, চোয়ালের গঠন, মাথার আকৃতি,হাড়ের গঠন,উচ্চতা,রং,ফর্সা,কালো,ধনী,গরিব ইত্যাদি বিবেচনায় মানুষকে আলাদা করাকে বর্ণবাদ বলে।

আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রীয় বর্ণবাদের অবসান ঘটলেও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন মাত্রায় বর্ণবাদ এখনো প্রচলিত। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বর্ণবাদ নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। CNN নিউজের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে পুলিশের গুলিতে শ্বেতাঙ্গ যুবকদের চেয়ে কৃঞ্চাঙ্গ যুবক নিহত হয়েছে একুশ গুন বেশি।

কিভাবে আসলো বর্ণবাদ? বর্ণবাদের মত অগণতান্ত্রিক ও অমানবিক ধারনা সেই প্রাচীনকাল থেকেই মানব সমাজে প্রচলিত ছিল। গবেষক এডিস স্যানডারস প্রাচীন ব্যাচিলনীয় ধর্মগ্রন্থ ‘তালমুদ’ থেকে উদ্ধতি দিয়ে বলেন,‘ নোয়া’ এর তিন সন্তানের মধ্যে একজন ছিলেন ‘হাম’ যিনি ছিলেন অভিশপ্ত। এই হামের বংশধররাই অভিশাপের কারণে কালো হয়ে জন্ম নেয়। আর তারাই হচ্ছে আফ্রিকার কালো মানুষ। এভাবে প্রাচীন কাল থেকেই গায়ের ত্বকের রং কে স্রষ্টার
 অভিশাপের ফল হিসেবে ব্যাখা করে কালো চামড়ার মানুষের ওপর সাদা চামড়ার মানুষের শ্রেষ্ঠত্ত্বদানের প্রবণতা লক্ষণীয়। তবে এটা যে স্রষ্টার সমর্থিত নয় তা আমি পূর্বেই প্রমাণ করে দিয়েছি। ইসলাম কখনো বর্ণবাদকে সমর্থণ করে না। মধ্যযুগে স্পেনীয়রা এই মতবাদ চালু করে যে, অভিজাতদের রক্ত লাল নয় বরং নীল। তারা বিশ্বাস করতো সাদা চামড়ার অভিজাতদের রক্ত আসলেই নীল। কারণ তা কখনো কালো শ্রেণীর মানুষের সাথে মিশে দূষিত হয়ে যায়নি।

প্রখ্যাত ফরাসি দার্শনিক ও ইতিহাসবিদ মিশেল ফুকো এর মতে, “বর্ণবাদের প্রকৃত উত্থান ঘটে প্রাক-আধুনিক যুগে যখন ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক আলোচনায় জাতিভিত্তিক সংগ্রামের বিষয়টি উঠে আসে।”  ফুকো আরো বলেন, বর্ণবাদ বিষয়টি সর্বযুগে ও সর্বস্থানে জেনোফেবিয়া অর্থাৎ বিদেশি বিদ্বেষ হিসেবে বিদ্যমান থাকলেও আধুনিককালে যে বর্ণবাদ দেখা দেয় তার উল্লেখ পাওয়া যায় ইংল্যান্ডের ১৬৮৮ সালের ‘গৌরবময় বিপ্লবের’ সময়কার এডওয়ার্ড কোক বা জন লিবানির লেখনীতে।
উনিশ শতকে বর্ণবাদী বা জাতিভিত্তিক মানবগোষ্ঠীর শ্রেষ্ঠত্ব বা নিকৃষ্টতার ধারণার ভিত্তিতে প্যান-জার্মানিজম, জিওনিজম, প্যান-তুর্কিজম,প্যান-এরাবিজম প্রভৃতি ধারণার বিকাশ ঘটে এবং বিশ্বের দিকে দিকে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ‘জাতি রাষ্ট্র’ গঠনের দিকে মোড় নেয়। এর ফলে বিশ শতকে কিছু কিছু ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় বর্ণবাদের ভয়ংকর রূপ দেখা যায়। এ কথা বলা যায়, বর্ণবাদের ধারক-বাহক হলেন এই গণতন্ত্রীরা। আজও গণতন্ত্রের অন্তরালে তারা বর্ণবাদের চাষাবাদ করছে। 

বর্ণবাদ-বিরোধী  নেতা কারা? বলতে গেলে সর্বপ্রথম উঠে  আসে বিশ্ব শান্তির অগ্রদূত বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ(সা)এর নাম। যিনি আরবের জাহিলিয়াতকে মাটির সাথে মিশিয়ে সেখানে শান্তির পতাকা উড্ডিন করেছিলেন। তাছাড়া বিলাল(রা) কে মুয়াজ্জিন হিসেবে নিয়োগ,বিদায় হজ্বেও ভাষণের উক্তি এটাই প্রমাণিত হয় যে তিনিই বর্ণবাদের বিরোধী  ছিলেন। একবার বিশিষ্ট সাহাবী হযরত আবু যর গিফারী (রা) তর্কের সময় বিলাল (রা) কে ‘কালো মায়ের সন্তান’ বলে সম্বোধন করলে রাসুল(সা) তাতে বিরক্ত হন। তিনি তখন আবু যর(রা) কে বলেন, ‘তুমি এমন ব্যক্তি, যার মধ্যে এখনো জাহিলিয়াতের চিহৃ রয়েছে’। রাসুল(সা) এর বর্ণবাদ ও জাতিবিদ্বেষ বিরোধী  শিক্ষা পরবর্তীতে আরবদের এ ধরনের কুসংস্কারমূলক মনোভাবের অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এসে ন্যায় ও সাম্যের পথে চলতে নির্দেশনা প্রদান করে। আমার বিবেচনায়, মুহাম্মদ (সা) একজন বিশুদ্ধ বর্ণবাদ বিরোধী ব্যক্তিত্ব। নিঃসন্দেহে তিনি এমন একস্থানে এমন এক সময়ে মানবাধিকারের পতাকাকে উত্তোলন করেন, যখন এ সম্পর্কে সেই সময়কার এবং সেই স্থানের মানুষের কোন পূর্ব ধারণাই ছিল না। 
পরবর্তীতে মহাত্মা গান্ধী, মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র, নেলসন ম্যান্ডেলা,ডেসমন্ড টুটু সহ অনেকেই বর্ণবাদের বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলেন। এছাড়াও বর্ণবাদের বিরুদ্ধে অনেক আন্দোলন ও সংগ্রাম গড়ে উঠে। বিশেষ করে মার্টিন লুথার  কিং এর বর্ণবাদ বিরোধি আন্দোলন,বঙ্গবন্ধুর বর্ণবাদ বিরোধি আন্দোলন, মহাত্মা গান্ধীর সত্যাগ্রহ আন্দোলন, নেলসন ম্যান্ডেলার বর্ণবাদ বিরোধি আন্দোলনসহ অসংখ্যা আন্দোলন।

তবে শেষ কথা হলো, যতদিন বিশ্বে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত না হবে, সাদা মেয়ে বিয়ের প্রবণতা না কমবে, সাদা গাড়ি গুলোর কালো চাকা লাগানো বন্ধ না হবে ততদিন বর্ণবাদ যাবে না। যতদিন দুভার্গ্য বোঝাতে কালো আরো শান্তি বোঝাতে সাদার ব্যবহার, কালো টাকা সাদা টাকার ব্যবহার, মন্দলোকেরা যতদিন কালো তালিকাভুক্ত থাকবে ততদিন বর্ণবাদ যাবে না। প্রত্যাশা হচ্ছে জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যু যেন সমাজে এবং মগজে বিদ্যমান বর্ণবাদের কাদা খানিকটা হলেও সাফ করে দেয়।

সাবেক শিক্ষার্থী, ইংরেজি বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়

No comments:

Post a Comment

Pages