সোশ্যাল ডিস্টেন্স || ছোটগল্প ||আমার খবর - amarkhobor24.com

শিরোনাম

Home Top Ad


Wednesday, May 27, 2020

সোশ্যাল ডিস্টেন্স || ছোটগল্প ||আমার খবর

ঢাকার এক অভিজাত হোটেলে বসে তানিয়া আর ফারিয়া নাস্তা করছিল।তারা দু'জন খুব ভালো বন্ধু হলেও ফারিয়া আর তানিয়ার আচার আচরণে অনেক ভিন্নতা রয়েছে।শৈশব থেকে তানিয়া স্বাস্থ্যবিধির প্রতি খুবই শ্রদ্ধাশীল এবং সব সময় পরিস্কার পরিচ্ছন্ন থাকত।এ জন্যে পরিবার এবং বন্ধু বান্ধবের কাছে সে ঠাট্টা বা বিদ্রুপের শিকার হয়।কেউ বুঝতে চাইতনা তার এই মানসিকতাকে।কারো প্লেইটে খাবার না খাওয়া,কারো ধরা ছোঁয়া কিছু না খাওয়া,কারো সাথে হ্যান্ডসেক না করাই ছিল তার চিরাচরিত  অভ্যাস।তানিয়ার মা মাঝে মাঝে কনফিউস হয়ে যায় তানিয়া আদৌ তাঁর মেয়ে কিনা।পরিবারের কারো আচরণের সাথে তার আচণ মিলেনা।সে সবসময় নিজেকে অন্যদের থেকে পৃথক রাখে।এতে করে সে পরিবারের সবার কাছে বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সাম্প্রাতিক বিশ্বমহামারী করোনাভাইরাসের কারণে সে আগের চেয়ে বেশি স্বাস্থবিধি মেনে চলছে।মুখে মাস্ক,হাতে গ্লাফস পরে থাকে সব সময়।নাস্তার ফাঁকে ফারিয়া তাকে বলল,এসব পরতে তো অসহ্যবোধ হয়না? তানিয়ার সরল উত্তর,সে স্বাস্থ্যবিধির বাইরে এক পাও বাড়াবে না। নাস্তা শেষে দু'জন হোটেল থেকে বেরিয়ে যায় ।কিন্তু ভুলক্রমে তানিয়া ব্যাগ ফেলে যায়।পাশের টেবিলে বসা ছিল দুই জন স্মার্ট ছেলে।তার মধ্যে রায়হান ছিল ওভার স্মার্ট।সে ইদানিংসামাজিক দূরত্ব রক্ষা করতে গিয়ে বন্ধুদের সাথে মোটেও মিশেনা।আজ সাইফুলের অনুরোধে বাসা থেকে বের হয়েছে।রায়হান ব্যাগটা নিয়ে দ্রুত হোটেল থেকে বেরিয়ে তানিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।তানিয়া, গাড়ির জন্যে অপেক্ষা করেছিল।রায়হান কে ধন্যবাদ জানিয়ে ব্যাগটা নেয় সে।রায়হান, তার পরিচয় দিল।তানিয়ার,আচরণ তার খুব ভালো লেগেছে।প্রথম দেখাতেই কোন মেয়েকে এতটা ভালো লাগবে সে কল্পনাও করেনি।

যাহোক,লজ্জা সরম বাদ দিয়ে মাথা চুলকাতে চুলকাতে বলে,যদি আপনার ফোন নাম্বারটা দিতেন।তানিয়া, হেসে বলল অন্য কাউকে হয়তো দিতাম না।আপনার ব্যবহার ভালো লেগেছে তাই নাম্বার দিচ্ছি।বিদায় নিয়ে দু'জনে বাসায় গিয়ে ফোনে কথা বলে।দু'জনের আচার আচরণে খুব মিল দেখে দু'জনই খুশি।পরদিন রায়হান মাকে বলল,মা তুমি যা খুঁজচ্ছিলে তা পেয়ে গেছি।মা কৌতুহলী হয়ে জানতে চাইল, কি খুঁজে পেলি?রায়হানের লাজুক উত্তর,তুমি চেয়েছিলে না  ঘরে একটা সুন্দর বউ আসুক? আর আমি সেটা খুঁজে পেয়েছি।মা তো খুশিতে অাত্মাহারা, তার আদরের সন্তান এতদিনে বিয়েতে রাজি হল।মা ছেলে আর ছোট বোন কে নিয়ে তানিয়ার বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যায়।তানিয়ার, মা বাবা  এক কথায় রাজি হয়ে গেলেন।কালবিলম্ব  না করে হয়ে যায় বিয়েও।বাসর রাতে দু'জনই নিজেদের লাকি ভাবছে।মনের সব আবেগ,অনুভূতি,ভালোবাসা জড়িয়ে দু'জন প্রেমালাপে মেতে উঠে।শূন্য দু'টি হৃদয়ে আজ বসন্তে আগন ঘটেছে।কোকিল গান না গাইলেও তাদের হৃদয়ে ভালোবাসার সুর।
শীতের মৌসমে যেন শ্রাবণের ভরা নদী।এই জন্যে ভালোবাসা উপচে পড়ছে।বিছানার পাশে হ্যান্ড সেনিটাইজার।

দু'জনই সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে ঘুমায়।উত্তর দক্ষিণ খাটের ডান দিকটাতে রায়হান এবং বাম দিকে তানিয়া ঘুমায়।খাওয়ার সময় তাদের দু'জনের আচণে রায়হানের মা ও বোন বেশ বিরক্ত হয়।আজ রায়হানের মা,তাদের দু'জনের আচণে কষ্ট পেয়েও চেপে রাখলেন।এভাবে তিন মাস অতিবাহিত হয়ে গেলো।আদৌ তাদের সামাজিক দূরত্বের কারণে শারিরীক সম্পর্ক হয়নি।গভীর রাতে,তানিয়ার ঘুম ভেঙ্গে গেলে এ নিয়ে চিন্তায় পড়ে।তারা স্বামী স্ত্রী হয়েও কেন এমন আচরণ করছে? কেউ কাউকে স্পর্শও করেনা।এটা কেমন ভালোবাসা?চারদিকে ঘনকালো অাঁধারে ঢেকে আছে।মনটা বাধভাঙ্গা জোয়ারের মত হু হু করে কাঁদছে।সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে গিয়ে আজ ভালোবাসার মানুষের কাছ থেকে ভালোবাসা অাদায় করতে পারছেনা।

তানিয়ার চোখে ঘুম নেই।চোখ জুড়ে অশ্রুর বন্যা।অশ্রুতে বুক ভিজে যায়।নোনা জল গড়িয়ে মুখে ঢুকে যাচ্ছে।এই যেন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে যাওয়ার গাড়ির ন্যায়।অশ্রু বারণ মানছেনা।প্রিয় মানুষকে জড়িয়ে ধরতে মন চাই কিন্তু সে তা পছন্দ করে না।পর দিন সকালে তানিয়া বললো,তোমার সাথে একটি ইমপ্রোটেন্ট কথা আছে।রায়হান কৌতুহলী হয়ে বলব,বলে ফেলো কি এমন কথা।তানিয়া বললো,মা; নাতি নাতনির মুখ দেখতে চাইছে।রায়হান রেগে আগুন,এ কি বলছো তুমি?  আমার দ্বারা এসব সম্ভব না।রাতে রায়হান তার ঘরে না গিয়ে পাশের ঘরে ঘুমিয়ে পড়ে।তানিয়া,কিংকর্তব্যবিমূঢ়। মাথায় কিছু ঢুকছেনা।প্রিয় মানুষটির এমন ঘাড ত্যাড়ামি তাকে বার বার কষ্ট দিচ্ছে।আঘাতে আঘাতে জর্জরিত তার কোমল হৃদয়।মানুষ বলে,নারীদের বুক ফাটে কিন্তু মুখ ফাটেনা।তানিয়ার বুক,মুখ দুটিই ফাটছে,ফাটছে না হতভাগা রায়হানের।তানিয়ার হৃদয়টা গুলির অাঘাতে যেমন ঝাঁঝরা হয়ে যায় তেমনটাই হয়েছে।

পর দিন সকালে রায়হান ঘরে ঢুকলে তানিয়া দরজা আটকিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে।জড়িয়ে ধরতে না ধরতে রায়হান তানিয়াকে ধাক্কা দিয়ে নিজেকে মুক্ত করে।তানিয়াকে ধাক্কা মেরে যেন বাঘের শিকার থেকে বাঁচলো সে।তানিয়া অালমারিতে ধাক্কা খেয়ে মাথায় ব্যথা পায়।তানিয়া ব্যথা পেয়েছে কিনা তাও জিজ্ঞাসা না করে কক্ষ থেকে চলে যায়।তানিয়া,অঝরধারায় কাঁদছে।এই যেন প্রাকৃতিক ঝরনা। ঝরনার ন্যায় প্রবাহিত চোখের অশ্রু।যার ভালোবাসায় যুগ যুগ কাটিয়ে দেওয়ার বাসনা থেকে বাবা মায়ের আদর মায়া ছেড়ে এসেছে সেই মানুষটি যখন অবহেলা করে তখন মনকে বুঝানোর ভাষা থাকে না।কত বান্ধবীকে শান্তনা দিয়েছে,কত বান্ধবীকে বুঝিয়ে স্বামী সংসার টিকিয়ে রেখেছে।অথচ আজ তার স্বামী সংসার ভেঙ্গে যাওয়ার পথে।এসব ভেবে অবুঝ শিশুর ন্যায় কাঁদতে থাকে।রায়হানের মা,এসব বুঝতে পেরে বউকে শান্তনা দেয়,ধর্যশীল হওয়ার পরামর্শ দেয়।তাতেও তানিয়ার হৃদয় শীতল হয়না।

মনে মনে ভাবছে,রায়হান যদি দিনের পর দিন তাকে অবহেলা করে তাহলে সে তাকে ত্যাগ করবে।তানিয়ার,চেহারায় যেন অমানিশার অাঁধারে ঢেকে আছে।কি সুন্দর মেয়ে,কি সুন্দর চাহনি যেন মাটির পৃথিবীতে জান্নাতের রমনী। কথা বলার ধরণ,স্মার্ট বাচনভঙ্গি, সহজ সরল কথাশৈলী যে কারো হৃদয় কাড়ে।এমন বউকে রায়হান কেন অবহেলা করে মা ভেবে অন্ত পায়না।তাহলে সে তানিয়াকে ভালোবেসে বিয়ে করলো কেন এসব প্রশ্নের কোন উত্তর পাচ্ছেনা।একদিকে ছেলে, অন্যদিকে ছেলের বউয়ের চোখে অশ্রু তাকে বিচলিত ও বিষন্ন করে তুলছে।তানিয়া,নাওয়া খাওয়া ছেড়ে দিয়ে মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েছে।সুখ খুঁজতে গিয়ে যেন দুঃখের সাগরে ডুব দিল তানিয়া

আজ হঠাৎ ছাদে ডাকলেন তানিয়াকে।তানিয়া ধীর পায়ে ছাদে গেল।ক্ষীণ কণ্ঠে জানতে চাইল কেন তাকে ডাকছে।রায়হানের চোখে মুখে হতাশার ছাপ।মুখটা নিকষ কালো ও ফ্যাকাসে।ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না কিভাবে কথা বলবে।হঠাৎ মেঘের ঘনঘটা।একটু পরেই বৃষ্টি নামতে পারে।এই বৃষ্টি আকাশ থেকে নয় রায়হানের চোখ থেকে।রায়হান কিছু বলতে গিয়েও থমকে গেল।নয়ন জুড়ে অশ্রুর নীরব বন্যা।এই যেন নির্বাক কাজী নজরুল।তানিয়া,কিছু বুঝে উঠতেই রায়হান তাকে জড়িয়ে ধরল।খোলা অাকাশের নিচে দুটি প্রাণের মিলন যেন প্রকৃতিও হাততালি দিচ্ছে।পাখিরাও যেন  কিচিরমির আওয়াজ তাদের অভিবাদন জানাচ্ছে।দুটি দেহ ঠিকই আজ একটি চিত্তে বন্দি। সকল বিরহ, সকল যাতনা ভুলে মাটির ধরণীতে স্বর্গীয় চোখ খুঁজে পেয়েছে।মৃত্যু অব্দি তাদের এই বন্ধন অটুট থাকুক সেই প্রার্থনা করছে রাজাধিরাজ মহান অাল্লাহর কাছে।

লেখকঃনুর আহমেদ সিদ্দিকী

No comments:

Post a Comment

Pages