প্রেমের টানে || ছোটগল্প ||নুর আহমেদ সিদ্দিকী ||আমার খবর - amarkhobor24.com

শিরোনাম

Home Top Ad


Thursday, May 21, 2020

প্রেমের টানে || ছোটগল্প ||নুর আহমেদ সিদ্দিকী ||আমার খবর

অন্যমনস্ক নাদিয়া ভাবনার রাজ্যে হারিয়ে গেছে।চোখের সামনে সিনেমার পদার মত ভেসে উঠছে অতীত স্মৃতি গুলো।যার হাত ধরে বাড়ি ছেড়েছে সেই প্রিয় মানুষটি পাশে থাকা স্বত্ত্বেও নাদিয়ার মনে বিন্দুমাত্র প্রশান্তি নেই।হৃদয়টা যেন ভেঙ্গে চৌচির। হৃদয়টাকে কেউ যেন করাত দিয়ে কাটছে।প্রিয় মানুষটিকে আপন করে পেতে নিজ অালয়,বাবা মাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে নিজেের মত করে বাঁচতে। উচিত ছিল আনন্দ চিত্তে প্রিয় মানুষটির সাথে খোশ  গল্প করতে করতে পথ চলা।কিন্তু আজ তার বিপরীতটাই হচ্ছে।গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরের সবুজ গাছ গুলো যেন পশ্চাতে ছুটে চলছে।সে সাথে পেছনে হারিয়ে যাচ্ছে বাবা মায়ের সাথে কাটানো মুহুর্ত গুলো।অাঁখি বেয়ে ঝরছে অশ্রু বন্যা।অশ্রু মানছে না বারণ।চোখ দুটি যেন খাদে পড়ে যাওয়া নিয়ন্ত্রণহীন গাড়ির ন্যায়।
গাড়ি চলছে আপন গতিতে।রাফি মাঝে মাঝে নাদিয়াকে শান্তনা দিতে চাইলেও নাদিয়া নির্বিকার চিত্তে অশ্রুসজল নয়নে জানালে দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে।হঠাৎ মায়ের ফোন।চমকে উঠে নাদিয়া।রাফির বারণ স্বত্ত্বেও ফোন রিসিভ করে সে।নিজেকে সামলে নিয়ে সালাম দেয় ।মা ভেজে কণ্ঠে বলে,তুই কোথায়? তোর বাবাকে ফোনে পাওয়া যাচ্ছে না।অনেকক্ষণ ধরে ফোন দিচ্ছি ফোন রিসিভ করছে না।মা,তুই একটু তোর বাবাকে ফোন করে দেখতো।নাদিয়া বেশ ক'বার ফোন দিয়েও কোন ফায়দা হয়নি।বাবা ফোন রিসিভ করছে না দেখে নাদিয়াও বিচলিত হয়ে পড়ে।রাফিকে বলে,আমি বাড়ি ফিরে যাব।প্লিজ, তুমি না করনা।রাফি, নাদিয়ার ফোনটা নিয়ে সুইচ বন্ধ করে দেয়।গাড়ি  ধীর গতিতে চলছে দেখে রাফি ড্রাইবারকে শাসায়।নাদিয়া বলল,তুমি উনাকে এভাবে কথা বলছ কেন? একটু সুন্দর ভাষায় বলো।আমরা যে পালাচ্ছি তা তো তিনি জানেন।পাছে,যদি বলে দেয়।

নাদিয়ার হৃদয়ে রক্তকরণ হচ্ছে। এই প্রথম সে মা বাবার অবাধ্য হচ্ছে।এ কথা ভাবতেই হৃদয়টা হু হু  করে কেঁদে উঠে। একটি মাত্র মেয়ে বলে বাবা শফিকুর রহমান অভাব বুঝতে দেয়নি।সবার আগে মেয়ের প্রয়োজন মেটাতে চেষ্টা করেছে।তারা দু'জন যার গাড়িতে উঠেছে সেই গাড়ির ড্রাইবার যে, নাদিয়ার বাবা তা তারা জানেনা।নাদিয়ার বাবা একজন বেসরকারি চাকরিজীবী।চাকরির বেতনে সংসার চালাতে হিমহিশ খেতে হয়।তাই অফিস টাইমের বাইরে যাত্রীবাহী মাক্রো গাড়ি চালায়।নাদিয়া আর রাফির অবস্থা পর্যাবেক্ষণ করছে বাবা।গাড়ি চালাচ্ছে তাই স্ত্রীর ফোন ও মেয়ের ফোন রিসিভ করছে না।তাছাড়া তাদের ফোন রিসিভ করলে ড্রাইবার যে তার বাবা তা জেনে যাবে।তিনি মুখে মাস্ক পরা।তাই নাদিয়া নিজের বাবাকে চিনতে পারেনি।তাছাড়া,তার বাবা গাড়ি চালাতে যাবেন কোন দুঃখে? তিনি তো চাকরি করেন।তাই সন্দেহও করেনি নাদিয়া।

কিছুক্ষণপর নাদিয়া তার ফোন ফের খুলে।ফোন খুলতে না খুলতে মায়ের ফোন।তোরা কি শুরু করলি বাবা মেয়ে? আমাকে কি পাগল করে দিবি? মায়ের কান্না শুনে বিচলিত নাদিয়া।নিজেকে সামলে নিয়ে বলে,মা আমি ক্লাসে ছিলাম তাই সুইচ অফ করে রেখেছি।বাবা মেয়ের এমন কান্ড দেখে নীরবে কাঁদছে।হৃদয় তাঁর ধূমড়ে- মূছড়ে যাচ্ছে।ভাবছে,মেয়েকে  হয়তো যথাযথ ভালোবাসতে পারেনি।হয়তো এমন কোন অাবদার, যা তিনি পূরণ করতে পারেনি। যার কারণে তাদের ছেড়ে অন্য ছেলের হাত ধরে পালিয়ে যাচ্ছে।তিনি নিজেকে অপরাধি ভেবে ধিক্কার ও তিরস্কার করছেন।ঝরছে চোখের অশ্রু।আজ মেয়ের এমন মনোভাবেে জন্য নিজেকেই দায়ী করছেন তিনি।ছোট বেলা থেকে ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনের তাগিদ দিলে হয়তো এমনটা হতোনা।গাড়ি  চালাতে চালাতে ভাবছে নাদিয়ার বাবা। সুখের সংসারে আজ তোষের আগুন জ্বলছে দেখে কষ্টে বুক ফেটে যাচ্ছে।শফিকুর রহমান,যেন আজ নির্বাক কাজী নজরুল।শব্দহীন কান্নায় অশ্রুতে বুক ভাসছে।বুঝানোর মানুষ পায়না।এ জীবন,এই হায়াত যার জন্যে উৎসর্গ করেছি সেই আদরের দুলালি আমাদের ভালোবাসাকে তুচ্ছজ্ঞান করে ত্রিসীমানার বাইরে পালি যাচ্ছে।বাবা হওয়াটাি কি আমার ভুল।হঠাৎ পেছন থেকে নাদিয়ার চিৎকার,ড্রাইবার গাড়ি থামান আমি নামব।গাড়ি থামানোর সাথে সাথে নাদিয়া কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলে,আমি তোমার সাথে যাব না।আগে বাবার খুঁজ নিই তারপর যা হবার হবে।

নাদিয়া গাড়ি থেকে নেমে সোজা তার বাবার অফিসে চলে যায়।অফিসের জিএম জহিরুল ইসলামকে বলল,আনকেল বাবা অফিসে আছে? তিনি বললেন,আজ তাঁর অফিস নেই।নাদিয়া কৌতুহলী হয়ে জিজ্ঞাসা করে,তাহলে বাবা ফোন ধরছে না কেন? জহিরুল ইসলাম দীর্ঘশ্বাসে বললেন,মা এতদিন এই গোপন কথা তোমাদের জানায়নি। আজ জানানোটা কর্তব্য বলে মনে করছি।অফিস থেকে যা মাইনে পায় তা দিয়ে তোমাদের সংসার চালাতে তোমার বাবাকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।তাই তিনি,অফিস টাইমের বাইরে যে সময় থাকে সে সময়ে গাড়ি চালায়।তাছাড়া, তুমি নাকি কলেজে যাওয়ার জন্যে স্কুটি কিনে দিতে বলেছ।সেই টাকা জোগাড় করতে তিনি গাড়ি চালাচ্ছেন।এতক্ষণ তিনি ড্রাইব করেছিল তাই তোমার ও  মায়ের ফোন রিসিভ করতে পারেনি।

একথা শুনে  নাদিয়ার মাথায় যেন সাত আসমান ভেঙে পড়েছে।সে কালবিলম্ব না করে দ্রুত পায়ে বাড়ি ফিরে।বাড়ি ফিরে মাকে জড়িয়ে ধরে কান্না শুরু করেছে থামানোর কোন উপায় নেই।অনেক্ষণ পর  সে সব ঘটনা মাকে খুলে বলে।মেয়ে নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে দেখে মেয়েকে শান্তনা দেয়।ঘন্টাখানেক পর বাড়িতে বাবা ফিরলে, বাবার পা জড়িয়ে ধরে কান্নাজড়িত কণ্ঠে ক্ষমা চায়।কাঁদতে কাঁদতে বলে,বাবা আমি বড় ভুল করেছি।তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও।আমার স্কুটি লাগবে না।আমাকে ক্ষমা করে দাও বাবা।মেয়েকে বুকে জড়িয়ে বাবা অাবেগাপ্লুত হয়ে বললেন,তোর দাদি মারা যাওয়ার পর মায়ের জন্য মনটা সদা কাঁদত।এর দুই বছরের মাথায় তোর জন্ম।এর পর থেকে তোর দাদির কথা মনে পড়তনা।তোকে মা বলে, ডেকে প্রশান্তি পেতাম।সবাই তুকে নাদিয়া বলে ডাকলেও আমি তুকে মা বলেই ডাকতাম।নাদিয়া বাবাকে কেঁদে কেঁদে বলে, যতদিন বাঁচি তোমাদের অবাধ্য হবনা বাবা।

লেখকঃনুর আহমদ সিদ্দিকী

No comments:

Post a Comment

Pages