কবি ফররুখ আহমদ বনাম ইসলামি আদর্শের জয়গান || মতামত || নুর আহমেদ সিদ্দিকী ||amarkhobor24.com - amarkhobor24.com

শিরোনাম

Home Top Ad


Tuesday, May 12, 2020

কবি ফররুখ আহমদ বনাম ইসলামি আদর্শের জয়গান || মতামত || নুর আহমেদ সিদ্দিকী ||amarkhobor24.com

অধিকাংশ কবি সাহিত্যিকরা নিজেদের প্রগতিশীল ভাবতে গিয়ে বামপন্থীদের সাথে মিশে যায়।নিজের আদর্শকে দেয় জলাঞ্জলি। বিকিয়ে দেন নিজের ধর্ম দর্শন ও ইতিহাস ঐতিহ্যকে।এই জগতে এসে খুব কম মানুষই প্রকৃত ধর্মের বিধান মেনে চলে।বাংলাদেশের ইতিহাসে যে ক'জন কবি, যারা নিজেদের কে স্রোতে গা ভাসিয়ে দেয়নি তাদের মধ্যে অন্যতম বা অগ্রগণ্য হলো কবি ফররুখ আহমদ।ইসলামি ঐতিহ্যের পুনরুজ্জীবনে বিশ্বাসী এ কবির কবিতায় প্রধান প্রকাশ ঘটেছে ইসলামি আদর্শ ও জীবনবোধের।

এখনকার কবি সাহিত্যিকদের অনেকেই ক্ষমতাসীনদের চাটুকারিতা করেই টিকে থাকে।পেয়ে যায় রাষ্ট্রীয় সম্মাননা।কবি ফররুখ আহমদ ছিলেন  একজন ধর্মভীরু, চিন্তাশীল লেখক,সাহিত্যিক ও কবি।যার চিন্তা চেতনায় মিশে ছিল ইসলাম।তার সাহিত্যে ইসলামের মহান আদর্শ ফুটে উঠেছে।বাংলা সাহিত্যের অাধুনিক কাব্যধারায় যে সব কবি ইসলামের গৌরব মহিমা ও পুনরুজ্জীবনের স্বপ্ন কবিতায় প্রমূর্ত করে তুলেছেন তাঁদের মধ্যে কবি ফররুখ আহমদ সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিভা।

জন্ম পরিচয়ঃইসলামের চেতনা ও ঐতিহ্যে উদীপ্ত কবি ফররুখ আহমদ ১৯১৮ সালে ১০ জুন যশোর জেলার মাঝআইল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।তাঁর শৈশব- কৈশোরের অনেকখানি সময় কলকাতায় অতিবাহিত হয়।স্কুল জীবনের প্রথাংশ  কলকাতায় কেটেছিল।

শিক্ষাজীবন ঃতিনি ১৯৩৭ সালে খুলনা জেলা স্কুল থেকে প্রথম বিভাগে প্রবেশিকা পরীক্ষা এবং ১৯৩৯ সালে কলকাতার রিপন কলেজ থেকে আই এ পাশ করেন।অতঃপর প্রথমে দর্শন ও পরে ইংরেজিতে অনার্স নিয়ে বি.এ পড়তে শুরু করেন।শেষ পর্যন্ত অবশ্যই পরীক্ষা দেওয়া হয়ে উঠেনি।স্নাতক শ্রেণিতে অধ্যয়নকালে তিনি বামপন্থী রাজনৈতিক আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন।অবশ্যই পরবর্তীকালে তাঁর এই রাজনৈতিক মতাদর্শে পরিবর্তন ঘটে।তাঁর কবিতার মধ্যে ইসলামের সুমহান আদর্শ ফুটে উঠেছে।বিরল কবি প্রতিভা গুণে তাঁর কবিতা বাংলা কাব্য সাহিত্যের ইতিহাসে অক্ষয় স্থান অধিকার করে আছে।

#আপোষহীনতাঃকবি ফররুখ আহমদ একজন ধর্মভীরু কবি ছিলেন।বিশ্বাসে,মেজাজ ও মননে ইসলামের প্রতি দুর্বল ছিলেন।হালাল হারাম যাচাই করেই জীবন যাপন করতেন।অসৎ উপায়ে অর্থপোর্জন তিনি কখনো চিন্তা করেননি।ইসলামের বিধি বিধান যথাসম্ভব মেনে চলতেন।ব্রিটিশ সরকার তাঁকে সরকারী অর্থায়নে হ্জ্ব করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন।তিনি সেই প্রস্তাব কে ঘৃণাভরে প্রত্যাখান করেছিলেন।শুধু তাই না তিনি বলেছিলেন,আমি নালার পানি দিয়ে অযু করিনা।সততা,সরলতা,ধর্মভীরুতা তার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। নীতি নৈতিকতার প্রশ্নে তিনি ছিলেন অটল ও অবিচল।

কবি ফররুখ আহমদ এর সাহিত্য জীবনঃ

কবি ফররুখ আহমদ ছাত্রজীবন থেকেই কাব্য সাধনা শুরু করেন এবং  ১৯৪৫ সালে পূর্বেই তিনি একজন প্রতিশ্রুতিবান কবি হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।কবি প্রতিভার স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৬০ সালে  ফররুখ আহমদ প্রেসিডেন্ট পুরস্কার " প্রাইড অব পারর্ফম্যান্স  এবং ১৯৬৬ সালে কবিতার জন্যে বাংলা  একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন।ঠিক একই বছর "পাখির বাসা" নামক  শিশুতোষ কাব্যের জন্যে ইউনেস্কোর পুরস্কার লাভ করেন।১৯৬৬ সালে তদানীন্তন পাকিস্তান সরকার তাঁকে "সিতারা-ই ইমতিয়াজ "খেতাবে ভূষিত করলে,  তিনি তা প্রত্যাখান করেন।তাঁর মৃত্যুর পরে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ১৯৭৭ সালে" একুশে পদক"  এবং ১৯৮০ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার দ্বারা মরণোত্তর সম্মান প্রদর্শন করা হয়।

কবি ফররুখ আহমদ বাংলা কাব্যে ত্রিশোত্তর ধারার উত্তরসাধক।কিন্তু চেতনা ও প্রকরণের দিক দিয়ে তিনি সাহিত্যজগতে এক নতুন প্রবাহের স্রষ্টা।মেজাজ ও মননে বিরাট পার্থক্য থাকা স্বত্ত্বেও ফররুখ আহমদ ছিলেন কবি নজরুলের মত উচ্চকণ্ঠ ও বলিষ্ট আশাবাদী কবি।তাঁর কবিসত্তা ছিল সৌন্দর্য- বিমুগ্ধ, নিঃসঙ্গ,প্রেমময়  ও ইসলামী স্বপ্নে বিভোর।বাংলা কাব্যজগতে ফররুখ আহমদ নিঃসন্দেহে একজন শক্তিধর ও স্বাতন্ত্র্যধর্মী কবি ব্যক্তিত্ব।

ত্রিশোত্তর দশকের বাস্তব জীবন-ভাবনা বা জটিল যুগ জিজ্ঞাসায় শরিক না হয়ে তৎকালীন মুসলমানদের স্বাধিকার চেতনার ঝান্ডা হাতে স্বাপ্নিক কবি ফররুখ আহমদের বাংলা কাব্যেমঞ্চে প্রবেশ- - এক বিশিষ্ট শিল্পী হিসেবে।তাঁর রচিত " সাত  সাগরের  মাঝি " কাব্যগ্রন্থটি শ্রেষ্ট কাব্যগ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।পরাধীন মুসলমানদের মুক্তিস্বপ্ন, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার ভাবনা " সাত সাগরের মাঝি" কাব্যগ্রন্থের মূল বিষয়।কবি শামসুর রহমান বলেছেন,--" সাত সাগরের মাঝি" আমাদের কাব্যসাহিত্যের  এক বিস্ময়কর ঘটনা। এই সাহিত্য কর্মেরই শ্রেষ্ট কবিতা" সাত সাগরের মাঝি"।

কবিতা তখনই সুন্দর হয় যখন তাতে ছন্দ,শব্দচয়ন  ও ভাবগাম্ভীর্য পরস্পর একত্রিত হয়ে অবিচ্ছেদ্য শিল্পকর্মে উত্তীর্ণ হয়। সুর ও ভাষা এক দেহে লীন করে সৃষ্টি করে এক স্বপ্নিল পরিবেশ ও মনোমুগ্ধকর চিত্র।কবিতার মুগ্ধ ঝঙ্কারও কাঁকনের রিনিঝিনি হয়ে পাঠক হৃদয়ে থাকে চির জাগ্রত।অপূর্ব কল্পনা আর অপরূপ উপমার বিন্যাসে তাঁর কাব্য পাঠকচিত্তে প্রচন্ড অভিঘাত তোলে।কবির সৃষ্ট" সাত সাগরে মাঝি" কাব্যের নাম কবিতা " সাত সাগরের মাঝি,তে স্বপ্ন ও প্রত্যশার মায়াময় রূপটিই পরিস্ফুটিত হয়ে পাঠকচিত্তকে আন্দোলিত করেছে।কবিতাটিতে দেখা যায় নবজাগরণের সাড়া জেগেছে, এখন একজন সুযোগ্য কর্ণধার তার নৌকার হাল শক্ত মুঠিতে চেপে ধরতে পারলেই সহজেই সঠিক বন্দরে পৌঁছাতে পারবে।সাত সাগরের মাঝির কর্মতৎপরতা ও সঠিক সিদ্ধান্তের ওপরই জাতির ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নির্ভরশীল।কবি "সাত সাগরের মাঝি,তে ইসলামী চেতনা ও আদর্শের জয়গান করেছেন।কবি হিসেবে ফররুখ আহমদের যে বৈশিষ্ট্য, সেই ধর্মীয় ঐতিহ্যের লালন সাত সাগরের মাঝি কবিতাটিতেও চমৎকারভাবে বিধৃত। অতীতের মুসলিম ঐতিহ্যে পটভূমিতে বর্তমানকে সংস্থাপিত করে কবি এই কবিতায় নতুন উপলব্ধির ব্যঞ্জনা পরিস্ফুট করে তুলেছেন।এ কবিতায় কবি কালপ্রবাহের ওপর দিয়ে বিজয়দৃপ্ত ইসলামি চেতনার রূপক হিসেবে মূলত সাত সাগরের মাঝিকেই কল্পনা করেছেন।

ইসলামি রেঁনাসার কবি ফররুখ আহমদের প্রত্যেক লেখায় ইসলামের আদর্শ ও ঐতিহ্য  স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।তাঁর কাব্যগ্রন্থ সিরাজাম্ মুনীরা গ্রন্থে ইসলামের সঠিক দর্শনের পরিচয় পাওয়া যায়।ব্যক্তিগত জীবনে ফররুখ আহমদ ছিলেন আপোষহীন ব্যক্তিক্রমধর্মী আদর্শিক মানুষ।দারিদ্র ও জীবন সংগ্রামের মধ্যে পর্যুদস্ত হলেও এই অপরাজেয় কবি কখনো তার আচরিত আদর্শ,জীবনবোধ ও নীতি থেকে বিচ্যুত হননি।১৯৭৪ সালে ১৯ অক্টোবর বাংলা সাহিত্যের এই প্রতিভাধর কবির জীবন প্রদীপ নির্বাপিত হয়।চলে যান চিরতরে মহান রবের কাছে।

লেখকঃনুর আহমদ সিদ্দিকী

No comments:

Post a Comment

Pages